সুনামগঞ্জ , সোমবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ , ১৬ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জামালগঞ্জে যুবদলের কর্মী সমাবেশে কৃষক লীগ নেতা! ‎সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটিতে নতুন সভাপতি শামস শামীম, সম্পাদক জসিম মাছশূন্য হাওর, সংকটে জল-জীবিকা ব্রিটিশ-বাংলাবাজার সড়ক বেহাল : দুর্ভোগে হাজারো মানুষ ভিপি নুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ হাউসবোটে নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা পর্যটকদের উদ্বেগ বাংলাবাজার ইউনিয়নে স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী সমাবেশ সুনামকণ্ঠ সাহিত্য পরিষদের আড্ডা অনুষ্ঠিত ঢাকায় জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ অনলাইন জুয়ার ‘হটস্পট’ জাউয়াবাজার প্রতিপক্ষের সুলফির আঘাতে নিহত ১ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে আ.লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ অনলাইন জুয়ায় নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ তাহিরপুরে দুই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগ ৬ রাউন্ড গুলিসহ বিদেশি রিভলবার জব্দ ছাতকে দু’পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৫ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরলে কবে থেকে কার্যকর হবে? একটি মহল চেষ্টা করছে গণতান্ত্রিক শক্তি যেন ক্ষমতায় না আসে : মির্জা ফখরুল বর্জ্যে ভুগছে টাঙ্গুয়ার হাওর হাওরের ফসল রক্ষায় প্রায় চূড়ান্ত ২,২৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প
হুমকিতে ৬৪ প্রজাতি, অতিবিপন্ন ৯, বিপন্ন ৩০, সংকটাপন্ন ২৫ প্রজাতির মাছ

মাছশূন্য হাওর, সংকটে জল-জীবিকা

  • আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ০৯:২৪:০৯ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ০৯:৩৮:০৮ পূর্বাহ্ন
মাছশূন্য হাওর, সংকটে জল-জীবিকা
বিশ্বজিত রায়::
‘হাওরে মাছ নেই, মৎস্যজীবীদের রুজি-রোজগারও নেই। তাই অনেক মৎস্যজীবী গার্মেন্টসে চাকরি করতে ঢাকায় চলে গেছে। এলাকায় যারা আছে তারাও কষ্টে আছে।’ কথাগুলো বলেন শাল্লা উপজেলার যাত্রাপুর হিলিফ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি হিমাদ্রী সরকার।
অবৈধ উপায়ে মাছ শিকার বন্ধ এবং মাছের অভয়াশ্রম তৈরিতে সরকারকে উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘জলাভূমি লিডার পার্সনদের ইজারা দেওয়ায় মৎস্যজীবীদের কোন লাভ হয় না। এই প্রথা বন্ধ করতে হবে।’ ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র পাতে এখন মাছ নেই। দেশীয় মাছের খনিখ্যাত সুনামগঞ্জের হাওর-জলাশয় ভরপুর বর্ষায়ও প্রায় মাছশূন্য হয়ে পড়েছে। এতে মৎস্য সংকটের পাশাপাশি জল-জীবিকায়ও বিরূপ প্রভাব পড়েছে। মানুষের আগ্রাসী কর্মকান্ড ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে হাওর থেকে মাছের দেশীয় প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে। মাছের সুদিন ফেরাতে হাওরাঞ্চলে বিশেষ সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।
সুনামগঞ্জ মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, হাওরে একসময় দেশীয় প্রজাতির ১৪৩ এবং ১২ প্রজাতির বিদেশি মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে ৬৪ প্রজাতির মাছ হুমকির সম্মুখীন, ৯ প্রজাতির মাছ অতিবিপন্ন, ৩০ প্রজাতির মাছ বিপন্ন এবং ২৫ প্রজাতির মাছ সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। দেশের বৃহত্তম মিঠাপানির জলাধার সুনামগঞ্জে হাওর আছে ৯৫টি। ১০৫টি খ-ে নদী আছে ২৬টি। মোট বিল ও জলমহালের সংখ্যা ১ হাজার ৩৫টি। পুরো জেলায় জলাশয়ের মোট আয়তন ৬৩ হাজার ৬৬৬ হেক্টর। এর মধ্যে হাওরের আয়তন ৩৫ হাজার ৯৯০ হেক্টর এবং নদ-নদীর আয়তন ৬ হাজার ৬১ দশমিক ০৬ হেক্টর। জেলার উন্মুক্ত জলাশয়ে বছরে ৮৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং পুকুরে ১০ দশমিক ৬২ শতাংশ মাছ উৎপাদন হয়। পুরো জেলায় বছরে মোট মাছের চাহিদা ৫৬ হাজার ৩৭২ মেট্রিক টন। উৎপাদন হয় ১ লাখ ১৪ হাজার ১৩০ মেট্রিক টন।
সুনামগঞ্জে নিবন্ধিত মৎস্যজীবী আছে ১ লাখ ১ হাজার ৩২৯ জন এবং অনিবন্ধিত মৎস্যজীবী ২০ হাজার ৪১৪ জন। তাদের অনেকেই মৎস্য আহরণের সাথে জড়িত না। হাওরে মৎস্য সংকট থাকায় বেশির ভাগ মৎস্যজীবীই অন্য পেশায় চলে গেছে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। জানা যায়, মহাশোল, সরপুঁটি, ঘারুয়া, বাঘাড়, রিঠা, চিতল, নাফতানি, বামোশ, রানী, চাকা, টাটকিনি, বাঁশপাতা, বাছা, ঢেলা, ফলি, দাড়কিনা, আইড়, পাবদা, তিতপুঁটি, কালিবাউস, নান্দিনা, খাশ খাইরা, তিলা শোল, শালবাইম, ঘাং মাগুর, নামা চান্দা, চিংড়ি, কাচকিসহ হরেক প্রজাতির মাছ বিপন্ন ও অতিবিপন্ন পর্যায়ে চলে গেছে।
সম্প্রতি সুনামগঞ্জের কয়েকটি হাওরের একাংশ ঘুরে দেখা গেছে, হাওরে মাছ ধরার নৌকা খুব কম। বিস্তীর্ণ হাওরের কোথাও জালসহ নৌকা তীরে ভেড়ানো অবস্থায় আছে। কোথাও নৌকায় করে চাঁই-জাল নিয়ে গন্তব্যে ছুটছে মৎস্যজীবীদের কেউ। আবার এক-দুই জায়গায় জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্যও চোখে পড়েছে। তবে হাওরে মাছ না থাকায় জেলেদের মুখে হতাশার কথাই ফুটে উঠেছে। পাগনার হাওরে কোনা জাল দিয়ে মাছ শিকার করা মুছা মিয়া (ছদ্মনাম) নামের এক মৎস্যজীবী বলেন, চার-পাঁচজনে এই জাল টাইন্যা (টেনে) যে মাছ পাওয়া যায়, তাতে জনে কোনরকম দুই-তিনশ’ টাকা কইরা (করে) পড়ে। কোনদিন এইডাও (এই টাকাও) হয় না। হাওরে মাছ নাই কইলেই (বললেই) চলে। কোন কাজ না থাকায় এইডাই ভরসা আমরার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিতল মাছের অভয়াশ্রম হালি হাওরের সুন্দরপুর বিল এখন চিতলশূন্য। এছাড়া চিতল মাছের খনি টাঙ্গুয়া হাওরের আলংডোয়ার এবং রৌ মাছের জন্য বিখ্যাত টাঙ্গুয়ার রৌয়ার হাওরেও এখন মাছ নেই।
টাঙ্গুয়ার হাওরের মৎস্যজীবী হরলাল দাস এক দশক আগের স্মৃতি আওড়ে বলেন, ‘টাঙ্গুয়ার আলংডোয়ার একটা জায়গা, যেডা (যা) চিতল মাছের খনি আছিল (ছিল)। ওই চিতল মাছ এখন আর নাই। সব শেষ হইয়া গেছে।
'দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হওয়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করে হাওর বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, হাওরের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ অর্থাৎ ঋতুভিত্তিক পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা বালিতে ডোবা-বিল, জলাভূমি ও কৃষিজমি ভরাট হচ্ছে। এতে হাওর ও নদীর উচ্চতায় পার্থক্য তৈরিসহ সংযোগস্থল বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে মাছের বিচরণস্থল হুমকিতে পড়ছে।
নিষিদ্ধ জাল-চাঁই এবং অসাধু উপায়ে মাছ শিকারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাওরের জলাভূমি অপরিকল্পিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত উপায়ে ইজারা দেওয়ার ফলে হাওরে কৃত্রিমভাবে আগ্রাসী প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। এতে দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক খাবারের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। বর্ষায় পাহাড়ী এলাকার কয়লা-চুনাপাথরের খনি থেকে সিলিকা-সালফার্ড জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ পানিতে মিশছে। রাসায়নিক নির্ভর কৃষি প্রচলনের ফলেও মাছের প্রজনন ক্ষেত্র বিনষ্ট হচ্ছে। যেটা মাছ, রেণুপোনা ও ডিমে মড়ক সৃষ্টি করছে। হাওরাঞ্চলের জন্য বিশেষ সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, হাওরে সকল প্রকারের ইজারা বাতিল করা উচিত। মাছ ধরার অধিকার শুধু জেলেদেরই থাকা আবশ্যক। জলাভূমি ও মাছ সংরক্ষণে জেলে সম্প্রদায়ের লোকায়ত জ্ঞান অর্থাৎ তাদের কৃষ্টি, আচার, রীতি, প্রথাকে জাতীয় নীতিমালায় অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি হাওর ও মৎস্য ব্যবস্থাপনায় জেলেদের সম্পৃক্ত করতে হবে।
হাওরে নিষিদ্ধ কর্মকান্ড ঠেকানোর পাশাপাশি মাছের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে মৎস্য অধিদপ্তর কাজ করছে জানিয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শামসুল করিম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সময়মতো বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। হাওর পানি স্বল্পতায় ভোগছে। নিষিদ্ধ জাল, কীটনাশক, অপরিকল্পিত বাঁধ, পলি জমে জলাশয় ভরাট, নাব্যতা সংকট, এগুলো মাছ বিলুপ্তির একেকটা কারণ। যার ফলে মাছের নির্বিঘ্নে চলাচল ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য মানুষের মাঝে সচেতনতা প্রয়োজন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স